গণতন্ত্র আর শুরা পদ্ধতি কি একই?
গণতন্ত্র:
গণতন্ত্র হলো এমন এক সিস্টেমের সরকার পদ্ধতি যেখানে একটি রাষ্ট্র বা প্রদেশের আইন, নীতিমালা , নেতৃত্ব এবং প্রধান উদ্যোগসমূহ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাধারণ জনগণ দ্বারা নির্ধারণ করা হয় । গ্রীক Dēmos (জনগণ) ও kratia ( ক্ষমতা,Rule) মিলে Dēmokratia গঠন করে এবং এখান থেকে Latin হয়ে French শব্দ Démocratia এবং Démocratia থেকে Democracy। এই পদ্ধতিতে সকল ক্ষমতা সাধারণ জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে। ভোটের ক্ষেত্রে সকল জনগণের মান একই। একজন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর আর একজন অশিক্ষিত ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার মান একই ধরা হয়। এই পদ্ধতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী চাইলেই কাউকে ক্ষমতায় বসাতে পারে আবার চাইলেই কাউকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করতে পারে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতা হতে কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। একজন ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বাদ দিলাম রাষ্ট্র পরিচালনা,কূটনীতি,দূরদর্শিতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও যদি না থাকে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থন থাকে তাহলেই সে একজন নেতা একজন দেশ পরিচালক হয়ে যেতে পারবেন। দেশের কোনো নিয়ম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেটা যদি অযৌক্তিক, ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক, কূটনৈতিক অক্ষমতাপূর্ণ বা অদূরদর্শিতাপূর্ণও হয় কিন্তু যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন থাকে তবে তা নিয়ম হিসাবে নির্ধারিত হয়ে যাবে। এর চমৎকার উদাহরণ আমাদের এবারের জাতীয় নির্বাচনের হ্যাঁ/না ভোট। এখানে আপনি হ্যাঁ দিলে বহুত্ববাদসহ ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক নানা বিষয় সংবিধানে জায়গা পাবে। আবার না দিলে পুনরায় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই পদ্ধতিতে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হয় পর্দার আড়ালের ক্ষুদ্র এক গোষ্ঠীর দ্বারা। আমরা অনেকে “ডিপস্টেট” বলেও সম্বোধন করে থাকি।
গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য:
• সকল সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনের ভিত্তিতে নেওয়া হবে
• নেতা হতে শুধুমাত্র জনগণের সমর্থন থাকলেই হবে (টাকা দিয়ে কেনা ,ভয়–ভীতি ও জোরপূর্বক হলেও)
• জ্ঞানী আর অশিক্ষিত সবার সিদ্ধান্তের মান সমান
• নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে দূরবর্তী সুফল না থাকলেও হবে (জনগণ না বুঝে খুশি থাকলেই যথেষ্ট)
• সবার সমতার কথা বলে অর্থাৎ সবাই সমান সুযোগ সুবিধা পাবে (একজন গরীব যদি 10টাকা পায় তবে একজন বড়লোকও 10 টাকা পাবে)
মজলিশে শু‘রা:
শু‘রা শব্দের আভিধানিক অর্থ পরামর্শ ,পরিকল্পনা।এটি মূলত ইসলামী শরীয়া আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি পদ্ধতি, একটি কাউন্সিল বা একটি সংসদকে বোঝায়। শু‘রা বা মজলিসে শু‘রা তথা ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ’ হচ্ছে একটি নির্বাচক কমিটি। অধিকাংশ আলিমদের মতে খলিফা নির্ধারণ এই কমিটির দায়িত্ব। মজলিশে শু‘রা তথা ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ’ এর সদস্যরা শরীয়া আইনের ভিত্তিতে খলিফা নির্বাচন করে থাকেন। তবে যে কেউ চাইলেই মজলিশে শূরার সদস্য হতে পারেন না। মজলিশে শু‘রার সদস্য হতে কিছু গুণ থাকা আবশ্যক,
• তাদের আদিল তথা তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবেন
• যথেষ্ট ইলম থাকতে হবে
• প্রজ্ঞা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হব
সাদউদ্দিন তাফতাজানি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা হবেন আলিম ও মানুষের মাঝে নেতৃত্ব স্থানীয়।”
মজলিশে শু‘রার সদস্যরা আবার কতগুলো শর্তের ভিত্তিতে একজন খলিফা নির্বাচন করবেন। খলিফা হওয়ার শর্তসমূহ,
• মুসলিম হওয়া
• সুস্থ মস্তিষ্কের হওয়া
• প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া
• পুরুষ হওয়া
উক্ত গুণাবলী একজন খলিফার থাকা আবশ্যক। একজন খলিফা তার কাজের জন্য মজলিশে শু‘রার কাছে জবাব দিহিতায় দায়বদ্ধ। জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো খলিফা নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না তবে খলিফা জনগণের উপর ন্যায়–ইনসাফের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন।
শু‘রা পদ্ধতি ও গণতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য:
• মজলিশে শুরা শরীয়া ব্যতীত অন্য কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারবে না। ওপর দিকে গণতান্ত্রিক সরকার নিজের ইচ্ছা মতো আইন প্রণয়ন করতে পারবে (সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে)
• খলিফা অবস্থা বুঝে অন্যদের মত নিতে পারেন আবার চাইলে নিজেই সিদ্ধান্ত দিতে পারেন (শরীয়া আইনের ভিতরে) । গণতান্ত্রিক সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় ,সেটা যত খারাপই হোক না কেন¡
• শু‘রা আল্লাহর আরোপিত আইন দ্বারা পরিচালিত। গণতান্ত্রিক সরকার মানবরচিত আইন প্রণয়ন করে।
• মজলিশে শু‘রার আইন প্রণয়নের কোনো ক্ষমতা নেই, এই ক্ষমতা একমাত্র আল্লহর। গণতান্ত্রিক সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নিজেরাই আইন তৈরি করে।
• মুসলিসে সুরার পদপ্রার্থী নিজে হতে পারবেনা। নিজের প্রশংসা নিজে ও আত্মপ্রচার করতে পারবে না । অপরদিকে গণতান্ত্রিক সরকারের সদস্যরা নিজেরাই পদপ্রার্থী হয় এবং নিজেরাই প্রচারণা চালায়।
• শরীয়া আইনে অপরাধের বিচার অবস্থা ও অপরাধের ভিত্তিতে অতিদ্রুত ও সর্বসম্মুখে প্রয়োগ করা হয়। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। (শরীয়া আইন থাকলে এতদিন হাদি ভাইয়ের হ*ত্যার বিচার হয়ে যেত)